[ইন্টারভিউ] অ্যান্ড্রয়েড ডিরেক্টর বললেন কেন নেক্সাসের দাম কম

গুগলের অ্যান্ড্রয়েড বিভাগের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর।

গত ২৯শে অক্টোবর গুগল তাদের বহুল প্রতীক্ষিত অনুষ্ঠান হারিক্যান স্যান্ডির কারণে বাতিল ঘোষণা করে ও ইন্টারনেটের মাধ্যমেই নতুন ডিভাইসসমূহের ঘোষণা দেয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে এলজি নেক্সাস ৪, আসুস নেক্সাস ৭-এর ৩২ গিগাবাইট ও ৩২ গিগাবাইট ৩জি সংস্করণ, স্যামসাং নেক্সাস ১০ এব অ্যান্ড্রয়েড জেলি বিনের আপগ্রেডেড সংস্করণ ৪.২। নতুন এই ডিভাইসগুলো সম্পর্কে নিউ ইয়র্ক টাইমস সম্প্রতি প্রশ্ন করেছে গুগলের অ্যান্ড্রয়েড বিভাগের বিজনেস ডেভেলপমেন্টের ডিরেক্টর জন ল্যাগেরলিংকে। তিনি জানিয়েছেন, কীভাবে তারা নেক্সাস ডিভাইসগুলোকে কম দামে নিয়ে আসছে, কেন মটোরোলাকে কিনে নেয়ার পরও মটোরোলা কোনো নেক্সাস ফোন বানাচ্ছে না এবং ভবিষ্যতে নেক্সাস ডিভাইস নিয়ে গুগলের পরিকল্পনা কী।

ইন্টারভিউর গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু পাঠকদের জন্য নিচে বাংলায় দেয়া হলো।

নিউ ইয়র্ক টাইমসঃ নতুন নেক্সাস ডিভাইসের উল্লেখযোগ্য বিষয় কী?
জনঃ
ব্যক্তিগতভাবে আমি এর ফটোস্ফিয়ার নামের সুবিধাটি বেশ পছন্দ করেছি। এটি ৩৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ছবি তুলতে সক্ষম। নেক্সাস ১০ ডিভাইসটিও অত্যন্ত পাতলা এবং এর রেজুলেশন খুবই ভালো। ফলে ছবি ও লেখা এতে বেশ ক্রিসপ দেখা যায়।

অন্যদিকে নেক্সাস ৪ ফোন নিয়েও আমি আনন্দিত। আমরা অনেক আলোচনার পর একটি আনলকড নেক্সাস ৪-এর দাম মাত্র ২৯৯ ডলারে নিয়ে আসতে পেরেছি যা আমরা কমদামে ভালো সেটের বিপ্লব বলে মনে করছি।

আরও পড়ুনঃ কী আছে অ্যান্ড্রয়েড ৪.২ জেলি বিনে

নিউ ইয়র্ক টাইমসঃ দাম এতোটা কমানো সম্ভব হলো কীভাবে?
জনঃ
আমরা মূলত এটা প্রমাণ করতে চেয়েছি যে নতুন প্রযুক্তি আছে এমন একটি ফোনের জন্য আপনাকে ৬০০ ডলার খরচ করতে হবে না। মূলত এতো দামে ফোন বিক্রি করাটাই অযৌক্তিক। আমরা বিশ্বাস করেছি যে এ ব্যাপারে আমরা কিছু করতে পারবো। আর তাই আমরা কমদামে উন্নত প্রযুক্তির স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট আনতে শুরু করেছি।

যাদের কাছ থেকে বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ নিয়ে আমরা কাজ করে সেসব পার্টনারদের সঙ্গে আমাদের বেশ ভালো বোঝাপড়া আছে। তাই আমরা নানাভাবে চেষ্টা করে ১৯৯, ২৯৯ ও ৩৯৯ ডলারেই এসব নেক্সাস ডিভাইস বাজারে ছাড়ছি।

নেক্সাস ৪, নেক্সাস ৭ ও নেক্সাস ১০

নিউ ইয়র্ক টাইমসঃ আমরা লক্ষ্য করেছি, প্রতিটি নেক্সাস ডিভাইস তৈরি করতে বেছে নেয়া হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানি। এটা কি অ্যান্ড্রয়েড জগতে প্রতিযোগিতাটা ন্যায় রাখার জন্য করা হচ্ছে?
জনঃ
প্রতিযোগিতা ন্যায় রাখার জন্য ঠিক না, আমরা যা অর্জন করতে চাচ্ছি, ঠিক তা করতে সক্ষম কোম্পানিগুলোকেই আমরা সে কাজের জন্য বেছে নিচ্ছি। যেমন বড় আকারের স্ক্রিন তৈরি করার জন্য স্যামসাং ইতোমধ্যেই বাজারে জনপ্রিয়। তাই আমরা তাদের সঙ্গে মিলে তৈরি করেছি নেক্সাস ১০। আসুসও ভালো ডিসপ্লে তৈরি করে বলে তাদের সঙ্গে মিলে আমরা এনেছি নেক্সাস ৭। এলজি বেশ ভালো এবং উন্নত প্রযুক্তির ফোন তৈরি করতে পারে। তাই আমাদের স্মার্টফোনের জন্য এবার এলজিকেই আমরা বেছে নিয়েছি।

আমরা সবসময়ই এমনটা করে এসেছি। নেক্সাস ওয়ানের আগে আমাদের লিড ডিভাইসটি তৈরি করেছিল এইচটিসি। এছাড়াও জুম ট্যাবলেটও একটি লিড ডিভাইস ছিল যেটি তৈরি করেছে মটোরোলা। আর এতোদিনে আমরা মোটামুটি দেখিয়েই দিয়েছি নেক্সাস প্রোগ্রামটি আসলে কী। আমরা নেক্সাস ৭ এর মাধ্যমে অত্যন্ত কম দামে এমন সব হার্ডওয়্যার দিয়েছি যা এই ক্যাটাগরির ট্যাবলেট মার্কেটকে নতুনভাবে সাজিয়েছে।

কিন্তু আমাদের মনে হয়েছিল ১০ ইঞ্চি ট্যাবলেটের মার্কেট ছিল অতিরিক্ত দামী আর হার্ডওয়্যারও ছিল খুব কম। আমরা দেখতে চাচ্ছি আমরা দাম কমাতে ও আধুনিক সব প্রযুক্তি দিয়ে একটি ১০ ইঞ্চি ট্যাবলেট তৈরি করলে কেমন হয়।

নিউ ইয়র্ক টাইমসঃ আপনাদের সঙ্গে মটোরোলার অবস্থান কোথায়? নেক্সাস ডিভাইসগুলোর একটিও মটোরোলা তৈরি করেনি।
জনঃ আমাদের অন্যান্য পার্টনারের মতোই মটোরোলার অবস্থান। সনি বা শার্পের অবস্থান যেখানে, আমাদের কাছে মটোরোলার অবস্থানও সেখানেই। তারা কেবলই আমাদের আরেকটি পার্টনার।

নিউ ইয়র্ক টাইমসঃ তাহলে মটোরোলা মোবিলিটি কিনে গুগল কীভাবে লাভবান হচ্ছে?
জনঃ
আমরা যেভাবে দেখছি, আমাদের মূল লাভ হচ্ছে পেটেন্ট। মটোরোলা মোবিলিটি কিনে আমরা তাদের প্রচুর পেটেন্টের মালিক হয়েছি। আমি একটু আগেই দামের কথা বলেছি। বাজারে অনেক কোম্পানি আছেন যারা প্রতিযোগিতামূলক দাম পছন্দ করেন না। তারা চান ডিভাইসের দাম বাড়িয়ে রাখতে। এটা কেবল কুপার্টিনোর ওরাই করে না (অ্যাপল), বরং অন্যান্য কোম্পানিও এই পরিকল্পনা করেছে। তারা দাম বেশি রাখতে চায় এবং সফটওয়্যারের জন্য উচ্চ মূল্য আদায় করতে চায়।

নেক্সাস

আমরা বিশ্বাস করি, এতো দাম না হাঁকিয়েও ডিভাইস বিক্রি করা সম্ভব। কেননা, কেবল বিক্রি থেকেই নয়, আয়ের আরও উৎস রয়েছে। এক্ষেত্রে পেটেন্টগুলোই ছিল অন্যান্য কোম্পানির প্রধান অস্ত্র যা কমদামী ডিভাইস তৈরিতে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করতো। তাই মটোরোলা কিনে নেয়ার মাধ্যমে আমরা দেখিয়েছি কম দামেও আমরা দারুণ সব ডিভাইস আনতে পারি।

(পাঠকদের বোঝার সুবিধার জন্য অনুবাদে বাড়তি অংশ বা ব্যাখ্যা যোগ করা হয়েছে)

এডিটর’স নোট

বাংলাদেশের মোবাইল ফোন বাজারে আমরা দেখেছি, চাইনিজ ফোন আসার পরপরই নকিয়াসহ বিভিন্ন মোবাইলের দাম কমতে শুরু করেছে। মানুষ কমদামে ভালো সেট পেলে অবশ্যই সেদিকেই চলে যাবে। আর তখন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোও বাধ্য হবে তাদের দাম কমাতে। একই ঘটনা আমরা মোবাইল ফোন অপারেটরের ক্ষেত্রেও দেখেছি। অনেকেই বলেন, বাংলালিংক তাদের কার্যক্রম শুরু করার পরপরই গ্রামীণফোনের আকাশছোঁয়া কলরেট কমতে শুরু করে। বাংলালিংক না আসলে গ্রামীণফোন আর সিটিসেলের কলরেট কখনোই কমতো না এমন মন্তব্যও অনেকের মুখেই শোনা যায়।

অ্যান্ড্রয়েড জগতে এখন ঠিক সেই ঘটনাই দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন কোম্পানি যখন “নতুন প্রজন্মের গ্যাজেট” হিসেবে স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট আকাশছোঁয়া দামে বিক্রি করছিল, তখন গুগল নাক গলাতে শুরু করলো। নেক্সাস ৭ একটি তুলনামূলক সফল ডিভাইস। আসুস জানিয়েছে, নেক্সাস ৭ বিক্রির সব প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। কেননা, মাত্র ১৯৯ ডলারে এতসব সুবিধা কেউ আশা করেননি। একইভাবে নেক্সাস ৪-এ ২৯৯ ডলারে এবং নেক্সাস ১০-এ ৩৯৯ ডলারে যেসব হার্ডওয়্যার দেয়া হয়েছে, তা স্যামসাং-এরই অন্যান্য ট্যাবলেটকে চিন্তায় ফেলে দেবে।

এই মাসের ১৩ তারিখে নতুন ডিভাইসগুলো বাজারে আসতে শুরু করলেই বোঝা যাবে কী অবস্থা হয় অ্যান্ড্রয়েড মার্কেটের। গুগল অ্যান্ড্রয়েড দিয়ে এতোদিন কেবল দেখে গেছে কীভাবে মানুষ একে ব্যবহার করেন ও এ থেকে কী কী আশা করেন। ২০০৮ থেকে এই পর্যন্ত দেখার পর এবার গুগলের পালা নিজে মার্কেটে নেমে পড়ার। নতুন নেক্সাস ডিভাইসগুলো দিয়ে সেটাই করতে যাচ্ছে গুগল।

গুগলের নেক্সাস ৪, ৭ ও ১০ নিয়ে আপনার কি মতামত?